সম্প্রতি দেশে এক অস্বস্তিকর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের—মন্ত্রী, সচিব, পুলিশ অফিসার কিংবা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের—নাম ও ছবি ব্যবহার করে প্রতারক চক্র হোয়াটসঅ্যাপে বা মেসেঞ্জারে বার্তা পাঠাচ্ছে। কখনো “জরুরি প্রয়োজনে অর্থ সহায়তা দরকার,” কখনো “একটি প্রকল্পে অবদান রাখতে হবে”—এমন নানা অজুহাতে অর্থ দাবি করা হচ্ছে। অনেকেই, ছবিতে পরিচিত মুখ দেখে, ভয় বা শ্রদ্ধার বশে প্রতারকদের ফাঁদে পড়ছেন।

বাংলাদেশ পুলিশ  জানিয়েছে যে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করে প্রতারণার বিরুদ্ধে সতর্ক থাকুন। প্রোফাইলে দায়িত্বশীল ব্যক্তির ছবি থাকলেই যে নম্বরটি তার, তা ধরে নেওয়া যাবে না। ডিজিটাল যুগে বিশ্বাস নয়, যাচাই হওয়া উচিত প্রথম পদক্ষেপ।

এমন ঘটনা কেবল বাংলাদেশের নয়। ভারতে প্রতারকরা কখনো মন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে ত্রাণ তহবিলের নামে টাকা তুলছে। ফিলিপাইনে রাষ্ট্রপতির ছবি ব্যবহার করে “দুর্যোগ সহায়তা” সংগ্রহের নামে জনগণের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের মতো দেশেও “ট্যাক্স অফিস” বা “ইমিগ্রেশন ডিপার্টমেন্ট”-এর নাম ভাঙিয়ে ফোন আসে—জরিমানা না দিলে গ্রেপ্তার করা হবে বলে হুমকি দেয়া হয়।

ডিজিটাল প্রযুক্তি আজ যেমন জীবন সহজ করেছে, তেমনি প্রতারণাকেও সহজ করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও ছবি সম্পাদনার মাধ্যমে মুহূর্তে তৈরি করা যায় কোনো জনপ্রিয় ব্যক্তির মতো দেখতে প্রোফাইল। হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জারের এনক্রিপশন প্রতারণাকে শনাক্ত করাও কঠিন করে তুলছে।

এ অবস্থায় জনসচেতনতা সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা। নাগরিকদের জানতে হবে—প্রোফাইলে ছবি বা নাম মিললেই সেটি আসল নয়। সন্দেহ হলে সরকারি দপ্তরের সরকারি নম্বর বা ওয়েবসাইটে যোগাযোগ করতে হবে।

নাগরিক সচেতনতার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপও জরুরি। ভারতের ‘সঞ্চার সাথী’ (Sanchar Saathi) নামের পোর্টালে যে কেউ জানতে পারেন তাঁর নামে কতটি সিম নিবন্ধিত এবং ভুয়া নম্বর রিপোর্ট করতে পারেন। সিঙ্গাপুরের ‘ScamShield’ অ্যাপ আবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে প্রতারণামূলক বার্তা শনাক্ত ও ব্লক করে দেয়। বাংলাদেশেও মোবাইলের মাধ্যমে জানা যায়। আপনার নামে কয়টি সিম আছে, তা জানার জন্য যে কোনো মোবাইল অপারেটর থেকে *16001# ডায়াল করে আপনার জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) শেষ ৪টি সংখ্যা লিখে একটি SMS পাঠান। এর উত্তরে আপনি একটি মেসেজ পাবেন যেখানে আপনার NID দিয়ে নিবন্ধিত সিমগুলোর নম্বর দেয়া থাকবে। একই সঙ্গে গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে নিয়মিত সতর্কতামূলক প্রচারণা চালাতে হবে।

প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। ডিজিটাল সাক্ষরতা মানে শুধু ইন্টারনেট ব্যবহার জানাই নয়—বরং তথ্য যাচাই, গোপনীয়তা রক্ষা, এবং সন্দেহজনক বার্তা সনাক্ত করা। স্কুল, কলেজ ও অফিস পর্যায়ে অনলাইন নিরাপত্তা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া উচিত।

অন্যদিকে, সরকারি কর্মকর্তাদেরও কেবল যাচাইকৃত (verified) সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার এবং অনানুষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্মে সরকারি যোগাযোগ সীমিত রাখার আহ্বান জানানো যেতে পারে।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *